প্রথম
পর্বের পর আবার আপনাদের কাছে Dhaka University সম্পর্কে জানানোর জন্য আসলাম।আশা
করি সবাই ভাল আছেন……..
পথচলাঃ
নানা প্রতিকূলতার
মধ্যেও ছাত্র-শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বিগত নয় দশকে এর গৌরবময় ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে। আজ যাঁরা দেশের শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসন, কূটনীতি, জনসংযোগ, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প কারখানায় নিয়োজিত রয়েছেন, তাঁদের প্রায় ৭০% এসেছেন এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষালাভ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় নি। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভারত সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হলে বঙ্গভঙ্গ রদের রাজকীয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। Dhaka University এর প্রথম উপাচার্য হন স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ। তিনি এর আগে ১৭ বছর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা রেজিস্ট্রার হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য ছিলেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে মুসলিম সংখ্যাগুরু পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের জনগণের মনে এক নতুন আশা ও উদ্দীপনার সঞ্চার হয়। কিন্তু মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রবল বিরোধিতার মুখে এ বিভক্তি রদ করা হলে মুসলমান সমাজ একে তাদের অগ্রযাত্রায় একটি বড় ধরনের আঘাত বলে মনে করে। প্রতীচ্য শিক্ষায় পঞ্চাশ বছর পশ্চাদ্বর্তী মুসলমানগণ বুঝতে পারে যে, শিক্ষাক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ হওয়াটাই সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। ব্রিটিশ কর্তৃক প্রবর্তিত শিক্ষা কার্যক্রম সাদরে গ্রহণের মাধ্যমে হিন্দু সম্প্রদায় সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়। পক্ষান্তরে, মুসলিম সম্প্রদায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পেছনে পড়ে থাকে। এ মনোভাব সম্পর্কে অন্তত চারটি কমিশন মন্তব্য করে, যার মধ্যে ছিল ১৮৮২ সালের হান্টার কমিশন, ১৯১২ সালের নাথান কমিটি, ১৯১৩ সালের হর্নেল কমিটি এবং ১৯১৭ সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন।
ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ বাংলা বিভক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তে মুসলিম সম্প্রদায়ের অসন্তোষের বিষয় উপলব্ধি করে তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। তখন মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন বিশিষ্ট নেতা ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ, নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এবং এ.কে ফজলুল হক। সাক্ষাৎকালে তাঁরা বঙ্গভঙ্গ রহিত করায় শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। বঙ্গবিভক্তি বিলোপের ক্ষতিপূরণ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তারা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান। লর্ড হার্ডিঞ্জ এ প্রস্তাবের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং বিষয়টি তিনি ব্রিটিশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর নিকট সুপারিশ করবেন বলেও অঙ্গীকার করেন। ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক সরকারি ঘোষণায় এ বিষয়টি স্বীকৃত হয়। লর্ড হার্ডিঞ্জ স্বীকার করেন যে, ১৯০৬ সাল থেকে পূর্ববাংলা ও আসাম উন্নতির পথে অনেকটা এগিয়ে গেছে। তিনি জানান যে, ওই বছর পূর্ববাংলা ও আসামে ১,৬৯৮ জন উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রী ছিল এবং ওই খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১,৫৪,৩৫৮ টাকা। অবস্থার উন্নতির ফলে ওই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২,৫৬০ ছাত্রছাত্রীতে এবং অর্থব্যয় হয়েছে ৩,৮৩,৬১৯ টাকা। ১৯০৫ থেকে ১৯১০-১১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা ৬,৯৯,০৫১ হতে ৯,৩৬,৬৫৩-তে উন্নীত হয় এবং প্রাদেশিক কোষাগার থেকে এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ১১,০৬,৫১০ টাকা থেকে ২২,০৫,৩৩৯ টাকায় বৃদ্ধি করা হয়। একইভাবে স্থানীয় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচ ৪৭,৮১,৮৩৩ টাকা থেকে বেড়ে ৭৩,০৫,২৬০ টাকায় দাঁড়ায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি সিদ্ধান্তে হিন্দু নেতৃবৃন্দ ক্ষুব্ধ হন। কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ভাইসরয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ঢাকায় একটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বস্ত্তত হবে বাংলাকে ‘অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্তির’ শামিল। তাঁরা আরও মত প্রকাশ করেন যে, পূর্ববাংলার মুসলিম সম্প্রদায় বেশির ভাগই কৃষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাদের কোনো উপকার হবে না। লর্ড হার্ডিঞ্জ প্রতিনিধিদলকে আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাকে পুনরায় বিভক্ত করার কোনো পদক্ষেপ সরকার কর্তৃক গৃহীত হবে না। তিনি আরও বলেন যে, এ নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হবে আবাসিক এবং তা সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
এক পর্যায়ে লর্ড হার্ডিঞ্জ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জীকে জানিয়ে দেন যে, তাঁদের বিরোধিতা সত্ত্বেও ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। উপরিউক্ত প্রতিরোধ ছাড়াও এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আরও কিছু আইনগত ও বস্ত্তগত জটিলতা ছিল।
লন্ডনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাভের পর ভারত সরকার ১৯২১ সালের ৪ এপ্রিল এক পত্রের মাধ্যমে বাংলা সরকারকে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত বিশদ পরিকল্পনা এবং এর আর্থিক সংশ্লেষ সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। এতদুদ্দেশ্যে ২৭ মে লন্ডনের ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানকে প্রধান করে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি নিয়োগ করা হয়। এ কমিটির সদস্য ছিলেন বাংলার গণশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক জি.ডব্লিউ কুচলার, কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট ড. রাসবিহারী ঘোষ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, নবাব সিরাজুল ইসলাম, ঢাকার জমিদার ও উকিল আনন্দচন্দ্র রায়, ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ডব্লিউ.এ.টি আর্চবোল্ড, জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ললিতমোহন চট্টোপাধ্যায়, ঢাকা মাদ্রাসার (পরবর্তীকালে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ, বর্তমান কবি নজরুল সরকারি কলেজ) সুপারিন্টেন্ডেন্ট শামসুল উলামা আবু নসর মুহম্মদ ওয়াহেদ, আলীগড়ের মোহাম্মদ আলী, কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ এইচ.আর জেমস, প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক সি.ডব্লিউ পিক এবং কলকাতা সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ সতীশচন্দ্র আচার্য। নাথান কমিটি নামে পরিচিত এ কমিটি Dhaka University এর জন্য একটি প্রকল্প প্রণয়ন করেন। প্রস্তাবে বলা হয় যে, এ বিশ্ববিদ্যালয় হবে শিক্ষাদান ও আবাসিক কার্যক্রম সম্বলিত প্রতিষ্ঠান এবং কেবল শহরের কলেজগুলি এর আওতাধীন থাকবে। কমিটি অতি দ্রুত ২৫টি বিশেষ উপকমিটির পরামর্শ গ্রহণ করে এবং ওই বছর শরৎকালের মধ্যেই তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত অবকাঠামোর ইমারতের নকশাসহ ৫৩ লাখ টাকা (পরবর্তীকালে গণপূর্ত বিভাগ কর্তৃক ৬৭ লাখ ঢাকায় উন্নীত) মূল ব্যয় এবং ১২ লাখ টাকা বাৎসরিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্তকাজ ও পাঠদানবিষয়ক তথ্যাদি বিশদ আকারে বর্ণিত হয়। কমিটির মতে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার, লিডস, লিভারপুল প্রভৃতি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় এ প্রতিষ্ঠানটি হবে একক আবাসিক শিক্ষাক্ষেত্র। ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ কলেজ, মোহামেডান কলেজ, উইমেন্স কলেজসহ সাতটি কলেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় থাকবে। কলা ও বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর শিক্ষাসহ আইন, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও অন্যান্য বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের আওতাভুক্ত থাকবে। পরবর্তীকালে এলাহাবাদ, বেনারস, হায়দ্রাবাদ, আলীগড়, লক্ষ্ণৌ এবং আন্নামালাইতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে Dhaka University এর মডেল অনুসরণ করা হয়।
বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার আওতায় পূর্ববাংলা ও আসাম সরকারের প্রশাসনিক দপ্তর প্রতিষ্ঠার জন্য রমনা এলাকায় ইতিপূর্বে অধিগ্রহণ করা ২৪৩ একর ভূমি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত হয়। কার্জন হল, ঢাকা কলেজ, নতুন সরকারি ভবন, সচিবালয়, সরকারি ছাপাখানা, সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসস্থল ও ছোটখাট ইমারত ওই এলাকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে এ সকল ইমারত, ভূমি ও স্থাপনা বার্ষিক এক হাজার টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থায়ী ইজারা দেওয়া হয়। নাথান কমিটির উল্লেখযোগ্য সুপারিশ হলো:
১. বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ও সরকারি কর্মকর্তা কর্তৃক পরিচালিত।
২. এটি হবে আবাসিক ও শিক্ষাদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়।
৩. ইসলামী শিক্ষা ও গবেষণা এর শিক্ষা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হবে।
১৯১৩ সালে কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প চূড়ান্ত করার পূর্বে জনমত যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ঐবৎসরই ডিসেম্বর মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রী কর্তৃক প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে সরকারের ওপর প্রচন্ড অর্থনৈতিক চাপের কারণে ১১,২৫,০০০ টাকা ব্যয়ের ছোট প্রকল্প বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থা মুসলিম নেতৃত্বের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে এবং বিষয়টি নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী কর্তৃক ১৯১৭ সালের ৭ মার্চ ভারতীয় বিধানসভায় উত্থাপিত হয়। সরকারি মুখপাত্র শঙ্কর নারায়ণ জানান যে, সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর, তবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের নিকট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প ও পরিচালনা বিষয়ে অভিমত চাওয়া হয়েছে এবং অভিমত পাওয়া গেলেই খসড়া বিল অনুমোদিত হবে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর লর্ড চেমস্ফোর্ড ১৯১৭ সালের ৬ জানুয়ারি এক অভিষেক অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সমস্যা ও চাহিদা নির্ণয়ের লক্ষ্যে একটি কমিশন গঠনের ঘোষণা দেন। লিড্স বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম.ই স্যাডলারের নেতৃত্বে ১৯১৯ সালে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদনে ব্রিটিশ প্রেসিডেন্সির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা স্বীকার করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বমোট ২৭,২৯০ জন ছাত্রের মধ্যে ঢাকা বিভাগ ও ত্রিপুরা জেলা থেকে ৭০৯৭ জন ছাত্র অধ্যয়নরত। সুতরাং ঢাকা ছাত্রসংখ্যার দিক থেকে মধ্যস্থান দখল করে আছে। কমিশন নাথান কমিটির বেশির ভাগ সুপারিশের সঙ্গে একমত পোষণ করে এবং অতিসত্বর বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার জন্য মত দেয়। স্যাডলার কমিশনের উল্লেখযোগ্য সুপারিশ:
১. Dhaka University এর অধিভুক্তিকরণ ক্ষমতা থাকবে না। এটির কাজ হবে শিক্ষা দান ও গবেষণা।
২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে স্বায়ত্তশাসিত একটি প্রতিষ্ঠান।
১৯১৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ইম্পেরিয়াল রেজিসলেটিভ কাউন্সিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিলটি উত্থাপিত হয়। সরকার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কাউন্সিলে উত্থাপিত বিলটি বিবেচনার জন্য পাঠায়। নভেম্বর মাসের ১ তারিখে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট বিলটি পরীক্ষা করার জন্য ৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের একমাত্র বাঙালি মুসলমান সদস্য হিসেবে খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ বিলটির পক্ষে জোরালো অভিমত পেশ করেন। সিনেটের অনেক সদস্যের বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৭ থেকে ২০ ডিসেম্বর (১৯১৯) আইনের কিছু কিছু অনুচ্ছেদ, ধারা ও উপধারা সংশোধন পরিমার্জন পূর্বক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিলটির খসড়া সিনেটের সম্মতি লাভ করে।
১৯২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় আইনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ওই বছর ১৮ মার্চ এটি আইনে পরিণত হয়। ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ ‘দি ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট’ গভর্নর জেনারেলের অনুমোদন লাভ করে। এ আইনের বলে ১৯২১ সালের ১ জুলাই Dhaka University এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। কমিশনের ১৩টি সুপারিশের প্রায় সবগুলিই ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্টে সন্নিবেশিত হয়। ভারতের গভর্নর জেনারেল ১৯২০ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগকে পাঁচ বছরের জন্য Dhaka University এর উপাচার্য নিয়োগ করেন। উপাচার্য ডিসেম্বরের ১০ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এ পর্যন্ত ২৭ জন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেন। Dhaka University এর প্রথম কোষাধ্যক্ষ (অবৈতনিক) ছিলেন জে.এইচ লিন্ডসে, আইসিএস (১-৭-১৯২১ থেকে ২০-২-১৯২২), প্রথম রেজিস্ট্রার খানবাহাদুর নাজির উদ্দিন আহমদ (১০-৪-১৯২১ থেকে ৩০-৬-১৯৪৪) এবং প্রথম প্রক্টর ফিদা আলী খান (১৯২৫-১৯৩০)। ১৯৭৬ সাল থেকে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর পদ সৃষ্টি করা হয়। প্রথম প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন ড. মফিজুল্লাহ কবির। এ পর্যন্ত ১৩ জন এ পদে দায়িত্বপালন করেন।
উপাচার্য
|
|
নাম
|
সময়কাল
|
স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ
|
০১.১২.১৯২০ থেকে ৩১.১২.১৯২৫
|
অধ্যাপক জর্জ হ্যারী ল্যাংলী
|
০১.০১.১৯২৬ থেকে ৩০.০৬.১৯৩৪
|
স্যার এ.এফ রহমান
|
০১.০৭.১৯৩৪ থেকে ৩১.১২.১৯৩৬
|
ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার
|
০১.০১.১৯৩৭ থেকে ৩০.০৬.১৯৪২
|
ড. মাহমুদ হাসান
|
০১.০৭.১৯৪২ থেকে ২১.১০.১৯৪৮
|
ড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন
|
২২.১০.১৯৪৮ থেকে ০৮.১১.১৯৫৩
|
ড. ওয়াটার অ্যালেন জেঙ্কিন্স
|
০৯.১১.১৯৫৩ থেকে ০৮.১১.১৯৫৬
|
বিচারপতি মুহম্মদ ইব্রাহিম
|
০৯.১১.১৯৫৬ থেকে ২৭.১০.১৯৫৮
|
বিচারপতি হামুদুর রহমান
|
০৫.১১.১৯৫৮ থেকে ১৪.১২.১৯৬০
|
ড. মাহমুদ হোসেন
|
১৫.১২.১৯৬০ থেকে ১৯.০২.১৯৬৩
|
ড. মোহাম্মদ ওসমান গনি
|
২০.০২.১৯৬৩ থেকে ০১.১২.১৯৬৯
|
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী
|
০২.১২.১৯৬৯ থেকে ২০.০১.১৯৭২
|
ড. মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী
|
২১.০১.১৯৭২ থেকে ১২.০৪.১৯৭৩
|
ড. আবদুল মতিন চৌধুরী
|
১৩.০৪.১৯৭৩ থেকে ২২.০৯.১৯৭৫
|
অধ্যাপক মুহম্মদ সামসউল হক
|
২৩.০৯.১৯৭৫ থেকে ০১.০২.১৯৭৬
|
ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী
|
০২.০২.১৯৭৬ থেকে ২০.০৩.১৯৮৩
|
ড. এ.কে.এম সিদ্দিক
|
২১.০৩.১৯৮৩ থেকে ১৬.০৮.১৯৮৩
|
ড. মোহাম্মদ শামসুল হক
|
১৭.০৮.১৯৮৩ থেকে ১২.০১.১৯৮৬
|
ড. আবদুল মান্নান
|
১২.০১.১৯৮৬ থেকে ২২.০৩.১৯৯০
|
অধ্যাপক এম মনিরুজ্জামান মিয়া
|
২৪.০৩.১৯৯০ থেকে ৩১.১০.১৯৯২
|
অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ
|
০১.১১.১৯৯২ থেকে ৩১.০৮.১৯৯৬
|
অধ্যাপক শহীদউদ্দিন আহমেদ
|
৩১.০৮.১৯৯৬ থেকে ২৯.০৯.১৯৯৬
|
অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ চৌধুরী
|
৩০.০৯.১৯৯৬ থেকে ১২.১১.২০০১
|
অধ্যাপক ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী
|
১২.১১.২০০১ থেকে ৩১.০৭.২০০২
|
অধ্যাপক ড. এ.এফ.এম ইউসুফ হায়দার
|
০১.০৮.২০০২ থেকে ২৩.০৯.২০০২
|
অধ্যাপক ড. এস.এম.এ ফায়েজ
|
২৩.০৯.২০০২ থেকে ১৬.০১.২০০৯
|
অধ্যাপক আ.আ.ম.স আরেফিন সিদ্দিক
|
১৭.০১.২০০৯ থেকে -
|
প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
৪৫টি সাধারণ সমাবর্তন এবং বেশ কয়েকটি বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এসব সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছাত্রছাত্রীদের
ডিগ্রি প্রদান করা ছাড়াও ৪০ জন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন
ব্যক্তিকে সম্মানসূচক ডক্টরেট (ডক্টর অব লজ, ডক্টর অব সায়েন্স, ডক্টর অব লিটারেচার) ডিগ্রি প্রদান করা হয়। সম্মানসূচক ডিগ্রিপ্রাপ্তদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, বিজ্ঞানী এস.এন বোস, অধ্যাপক আবদুস সালাম, অধ্যাপক অমর্ত্য সেন, আধুনিক মালয়েশিয়ার
রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ, অধ্যাপক মুহম্মদ ইউনুস প্রমুখ।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রথম সমস্যা ছিল, বাংলা সরকার আইনসভার অনুমোদন ব্যতীত সরকারি খাত থেকে কোন অর্থ ব্যয় করতে পারে না বিধায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয়
অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। প্রথম কোর্ট সভায় আচার্য বলেন যে, তাঁর দ্বিতীয় সমস্যা হলো মুসলিম সম্প্রদায়ের উচ্চাশা পূরণ। সব রকম সুযোগসুবিধা
দিয়েও প্রশাসন মাত্র অল্পসংখ্যক মুসলিম শিক্ষক সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়, এমনকি মুসলমান ছাত্রের সংখ্যাও তখন দাঁড়ায় মাত্র ৯%। নাথান কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বাৎসরিক ব্যয় ১৩ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করলেও বাংলার শিক্ষামন্ত্রী
স্যার প্রভাস মিত্র এর থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা কমিয়ে দেন। ভারত সরকার ক্যাপিটেল খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার ফান্ড বাংলা সরকারের কাছে হস্তান্তর করলেও প্রভাস মিত্র ওই ফান্ড প্রাদেশিক ফান্ডেলর সাথে মিলিয়ে মাত্র নয় লক্ষ টাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রদান করেন। তাঁর যুক্তি ছিল যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রচুর সরকারি ইমারত ও বিস্তর জায়গা-জমি বাংলা সরকারের কাছ থেকে পেয়েছে।
উপাচার্য কোর্টকে জানান যে, শিক্ষামন্ত্রী
বিশ্ববিদ্যালয়কে বাৎসরিক ব্যয় সংকুচিত করে পাঁচ লক্ষ টাকার মধ্যে সীমিত রাখতে বলেছেন। ইসলামিক স্টাডিজ, ইংরেজি, রসায়ন এবং অর্থনীতি অনুষদের ওপর এ ব্যয় সংকোচনের প্রতিকূল প্রভাব পড়বে। মি. হার্টগ জানান যে, অসহযোগিতাকারীরা শিক্ষার্থীদের
বেতন ৮ টাকার পরিবর্তে ৬০ টাকা করার গুজব রটিয়েছে। এতে ছাত্ররা ১৯২১ সালে প্রথম সেশনে ভর্তিতে নিরুৎসাহিত হয়। এ অবস্থার মোকাবেলার জন্য সরকারি ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্রদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। ফলে তখন ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজে শুধু ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ের ছাত্রদের শিক্ষাদান অব্যাহত থাকে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্র সমস্যার সমাধান হয়। পি.জে হার্টগ ১৯২২-২৩ সালে বার্ষিক কোর্ট মিটিং-এ Dhaka University এর এক বছরের কৃতিত্ব নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন। পাঁচ বছরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির একটি মজবুত ভিত রচনা করে হার্টগ উপাচার্যের পদ থেকে অবসর নেন এবং পরবর্তীকালে
তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি জর্জ হ্যারি ল্যাংলি, এ.এফ রহমান, ড. আর.সি মজুমদার, ড. মাহমুদ হাসান প্রমুখ এ বিশ্ববিদ্যালয়কে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যান।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন
থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ‘Truth shall Prevail’ শ্লোগান লেখা একটি মনোগ্রাম এর মনোগ্রাম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। পরবর্তী সময়ে এ মনোগ্রাম তিনবার পরিবর্তন করা হয়। পরিবর্তিত প্রথম মনোগ্রামে আরবিতে ‘ইকরা বিস্মে রাবিবকাল লাজি খালাক্ক’ (১৯৫২-৭২), দ্বিতীয় মনোগ্রামে ‘শিক্ষাই আলো’ (১৯৭২-৭৩) এবং ‘শিক্ষাই আলো’ লেখা সম্বলিত নতুন ডিজাইনের তৃতীয় মনোগ্রাম অদ্যাবধি ব্যবহার করা হচ্ছে।
বি.দ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃস্টিতে দেখবেন।কোথাও কোন কিছু যোজন বা বিয়োজনের প্রয়োজনের হলে কমেন্টে জানাবেন।
চলবে....................

No comments:
Post a Comment